
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের দুর্দান্ত জয়
দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রবিবার অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৪৪ রানে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। ভারতের দেওয়া ২৫০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ২০৫ রানেই গুটিয়ে যায় কিউইরা।
বল হাতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ভারতীয় দলের জয়ের নায়ক হয়েছেন রহস্যময় স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী, যিনি একাই শিকার করেন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় ভারতীয় দল। মাত্র ১৫ রানে ওপেনার শুভমান গিলের উইকেট হারায় তারা। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা গিলকে কাইল জেমিসনের বুদ্ধিদীপ্ত ডেলিভারিতে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয়। অধিনায়ক রোহিত শর্মাও বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেননি। পুল শট খেলতে গিয়ে স্কয়ার লেগে উইল ইয়াংয়ের হাতে ধরা পড়েন তিনি। মাত্র ১৯ রান করে সাজঘরে ফেরেন রোহিত।
ভারতের ব্যাটিং বিপর্যয় এখানেই থামেনি। দলের অন্যতম ভরসা বিরাট কোহলিও ব্যর্থ হন। গত ম্যাচে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করা কোহলি এদিন মাত্র ১১ রান করে বিদায় নেন। ম্যাট হেনরির অসাধারণ ডেলিভারিতে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে গ্লেন ফিলিপসের দুর্দান্ত ক্যাচ কোহলিকে সাজঘরে পাঠায়। মাত্র ৩০ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে ভারত।
এই পরিস্থিতিতে দলকে টেনে তোলেন অক্ষর প্যাটেল ও শ্রেয়াস আইয়ার। চতুর্থ উইকেটে তারা ৯৮ রানের জুটি গড়েন। যখন মনে হচ্ছিল, এই জুটি বড় সংগ্রহের দিকে এগিয়ে যাবে, তখনই রাচিন রবীন্দ্রের বলে উইকেটের অসমান বাউন্সের শিকার হয়ে ৪২ রান করে ফেরেন অক্ষর। এরপর শ্রেয়াস আইয়ার ও লোকেশ রাহুল মিলে পঞ্চম উইকেটে ৪৪ রানের জুটি গড়েন।
রানের গতি বাড়াতে গিয়ে শ্রেয়াস আইয়ার একটি ভুল শট খেলেন এবং ৯৮ বলে ৭৯ রান করে আউট হন। এই ইনিংসে তিনি চারটি চার ও দুটি ছক্কা হাঁকান। রাহুলও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি, ২৯ বলে ২৩ রান করে দলীয় ১৮২ রানে ফেরেন। এরপর পাওয়ার হিটার হার্দিক পান্ডিয়া ও রবীন্দ্র জাদেজা দলের রান বাড়ানোর দায়িত্ব নেন। পুরনো বলে ব্যাটিং করা কঠিন হয়ে উঠলেও পান্ডিয়া ৪৫ বলে ৪৫ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন, যেখানে চারটি চার ও দুটি ছক্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত ভারত ৯ উইকেট হারিয়ে ২৪৯ রান সংগ্রহ করে।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে ম্যাট হেনরি ছিলেন সবচেয়ে সফল বোলার। ৮ ওভারে মাত্র ৪২ রান দিয়ে পাঁচটি উইকেট শিকার করেন তিনি। এছাড়া একটি করে উইকেট নেন মিচেল স্যান্টনার, উইলিয়াম ওরোর্ক, রাচিন রবীন্দ্র ও কাইল জেমিসন।
২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিউজিল্যান্ডের শুরুটা মোটেও ভালো হয়নি। দলীয় ১৭ রানের মাথায় ওপেনার রাচিন রবীন্দ্রকে হারিয়ে বিপাকে পড়ে তারা। পাওয়ারপ্লেতে অবশ্য তারা কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ১০ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৪৪ রান তোলে।
কিন্তু পাওয়ারপ্লের পরপরই ভারতের স্পিন জাদু শুরু হয়। রহস্য স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী ২২ রান করা উইল ইয়াংকে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড করে ফেরান। বল যত পুরোনো হতে থাকে, উইকেটে ব্যাটিং করা তত কঠিন হয়ে ওঠে। ভারতীয় স্পিনারদের সামলাতে কিউই ব্যাটারদের বেশ বেগ পেতে হয়।
তবে কিউই ব্যাটাররা সহজে হার মানেননি। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন ও ড্যারেল মিচেল তৃতীয় উইকেটে ৪৪ রানের জুটি গড়েন। কিন্তু ব্যক্তিগত ১৭ রানে রবীন্দ্র জাদেজার বলে মিচেল আউট হলে ফের চাপে পড়ে নিউজিল্যান্ড।
একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান উইলিয়ামসন। চতুর্থ উইকেটে টম লাথামকে সঙ্গে নিয়ে আরও ৪০ রান যোগ করেন তিনি। দলীয় ১৩৩ রানের মাথায় লাথাম আউট হলে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন যেন হুট করেই ভেঙে পড়ে।
আরও পড়ুনঃ- ৮ গোলের রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালে অ্যাতলেটিকোর বিপক্ষে বার্সেলোনার ড্র
৩৬ রানের ব্যবধানে চারটি উইকেট হারায় তারা। উইলিয়ামসন লড়াই চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি আর ধৈর্য রাখতে পারেননি। ১২০ বলে ৮১ রান করা এই অভিজ্ঞ ব্যাটার অক্ষর প্যাটেলের বলে স্টেপ আউট করে মারতে গিয়ে স্টাম্পিং হন।
শেষদিকে কিছুটা চেষ্টা করেন মিচেল স্যান্টনার। ৩১ বলে ২৮ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে দলকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন, তবে সেটা জয়ের ব্যবধান কমানোর বাইরে আর কোনো কাজে আসেনি।
ভারতের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে বিধ্বংসী ছিলেন বরুণ চক্রবর্তী। ৮ ওভারে ৩৭ রান দিয়ে পাঁচটি উইকেট শিকার করেন তিনি। এছাড়া কুলদীপ যাদব দুটি উইকেট নেন। নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন ভারতের স্পিন আক্রমণের সামনে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে।
এই জয়ের ফলে ভারত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ পর্বের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করল। পুরো ম্যাচেই ভারতীয় দল স্পিন বোলিংয়ের অসাধারণ প্রদর্শনী দেখিয়েছে। বরুণ চক্রবর্তী ও কুলদীপ যাদবের বলের ঘূর্ণিতে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা অসহায় হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ভারতের ব্যাটিং ইনিংসে শ্রেয়াস আইয়ার ও হার্দিক পান্ডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ব্যাটিংয়ে শুরু থেকে সংগ্রাম করলেও বোলিংয়ের দাপটে ভারত শেষ পর্যন্ত দারুণ জয় তুলে নেয়।
ভারতীয় দলে এই ম্যাচে একাধিক ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করা গেছে। বরুণ চক্রবর্তীর অসাধারণ বোলিং, শ্রেয়াস আইয়ারের ধৈর্যশীল ইনিংস এবং হার্দিক পান্ডিয়ার শেষ মুহূর্তের ঝড়ো ব্যাটিং ভবিষ্যতে দলের জন্য আশার আলো হয়ে থাকবে।
এই জয়ের মাধ্যমে সেমিফাইনালে আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নামতে পারবে রোহিত শর্মার দল। ভারতের শক্তিশালী স্পিন আক্রমণ ও ব্যাটিং গভীরতা এই টুর্নামেন্টে তাদের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে তুলে ধরেছে। আগামী ম্যাচগুলোতে তারা এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে শিরোপার দৌড়ে বড় প্রতিযোগী হয়ে উঠবে।
ডেস্ক রিপোর্টার
সর্বাধিক পঠিত
Loading...