
অবসরের সিদ্ধান্ত মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ'র, ১৮ বছরের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি
বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক গৌরবময় অধ্যায়ের ইতি টানলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দীর্ঘ ১৮ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর অবসরের ঘোষণা দিলেন এই অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে ক্রিকেটকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।
নিজের বিদায়ী বার্তায় মাহমুদউল্লাহ লেখেন, “সবকিছু হয়তো নিখুঁতভাবে শেষ হয় না, কিন্তু একসময় থামতেই হয়। সময় এসেছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। আলহামদুলিল্লাহ, আমি শান্তিতে আছি।” তার এই সংক্ষিপ্ত বার্তায় ফুটে উঠেছে তৃপ্তি ও আবেগের মিশ্র অনুভূতি। দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য স্মৃতি, সাফল্য ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি, আর এবার সময় হয়েছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার।
২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়ে পরিণত হন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ব্যাট হাতে দলের প্রয়োজনে লড়াই করেছেন অসংখ্যবার, কখনো মিডল অর্ডারে, কখনো আবার লোয়ার মিডল অর্ডারে থেকে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন। শুধু ব্যাটিং নয়, বোলিংয়েও দলের প্রয়োজনে কার্যকরী অবদান রেখেছেন। তার অফস্পিন বোলিং অনেক সময়ই বাংলাদেশ দলকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছে।
বিশেষ করে আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোতে মাহমুদউল্লাহ বাংলাদেশ দলের জন্য ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একজন পারফরমার। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত সেঞ্চুরি বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দেয়, যা ছিল দলের জন্য ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত। একই বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষেও সেঞ্চুরি করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান, যিনি বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছেন।
মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় স্মৃতি সম্ভবত ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ, যেখানে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার অসাধারণ সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠে যায়। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে মিলে গড়া সেই ম্যাচজয়ী জুটি আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।
তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংসগুলোর একটি ছিল ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে। চাপের মুখে ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দলকে জিতিয়ে আনেন। এই ধরনের বহু ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ ছিলেন দলের জন্য নির্ভরতার প্রতীক।
শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, মাহমুদউল্লাহ ছিলেন একজন পরিপূর্ণ নেতা। ২০১১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক হন এবং পরবর্তীতে নেতৃত্বের গুরুদায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন। ২০১৮ সালে টেস্ট দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান, যদিও খুব বেশি দিন নেতৃত্ব দেননি। তবে ২০১৯-২১ সময়কালে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুনঃ- আফগানিস্তান'র ক্রিকেট নিষিদ্ধের দাবিতে বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ
তার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হারে ব্যাকফুটে চলে গেলেও পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন মাহমুদউল্লাহ। বিশেষ করে তার অধীনে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মাহমুদউল্লাহ ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ২০২১ সালে টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি। এরপর ২০২৩ সালে টি-টোয়েন্টি থেকেও অবসর নেন। তবে ওয়ানডেতে খেলে যাচ্ছিলেন তিনি, যেখানে তার অভিজ্ঞতা দলের জন্য অনেক বড় সম্পদ ছিল। অবশেষে ২০২৪ সালে এসে তিনি ওয়ানডে থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে তার সম্পূর্ণ বিদায়ের বার্তা দেয়।
এদিকে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে জাতীয় দলের দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের অবসর দেশের ক্রিকেটে বড় এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত সপ্তাহে ওয়ানডে থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মুশফিকুর রহিম, এবার তার পথ অনুসরণ করলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
মাহমুদউল্লাহর বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট এক অভিজ্ঞ, নির্ভরযোগ্য এবং ম্যাচ উইনার খেলোয়াড়কে হারালো। তবে ক্রিকেট মাঠ থেকে সরে গেলেও, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ দেশের ক্রিকেটের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকবেন, এটাই প্রত্যাশা ক্রিকেট ভক্তদের।
ডেস্ক রিপোর্টার
সর্বাধিক পঠিত
Loading...